মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

লোকসংস্কৃতি:

লোকসংস্কৃতির জন্য কেন্দুয়া উপজেলার দেশ বিদেশে খ্যাতি রয়েছে। এ উপজেলায় ঘাটুগান, মাড়ওয়া, জারি লম্বাগীত (পালাগীত) বাউল গানের প্রতি সাধারণ মানুষের আর্কষন রয়েছে। জারি, ঘাটুগান, পালাগীত অবশ্য সারা নেত্রকোণা জেলাতেই পরিবেশিত হতো।

জাতীয় পর্যায়ের সংস্কৃতি

বাউল জালাল উদ্দিন খাঁ, বাউল আক্ষেদ আলী, বাউল দ্বীন শরৎ কেন্দুয়া উপজেলাকে বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন ভাবে পরিচিতি করিয়েছে। দ্বীন শরৎ এর সেই দেশখ্যাত গান- গুরু উপায় বলনা, জনম দুখী কপাল পোড়া গুরু আমি একজনা। এ গানটি বাংলা চলচ্চিত্রে সংযোজিত হয়েছিল।

মাড়ওয়া:

‘মাড়ওয়া’ কেন্দুয়ার লোকাচারমুলক অনুষ্ঠান কেন্দুয়ার লোকজন বংশ পরস্পরায় এ অনুষ্ঠান পালন করে আসছে। ফাল্গুন, চৈত্র কখনো কখনো কার্তিক মাসে অনাবৃষ্টি দেখা দিলে মহিলারা মেঘের (বৃষ্টিকে স্থানীয়রা মেঘ বলে) এ আচার পালন করে।

মাড়ওয়া নির্মানের জন্য কলাগাছ প্রয়োজন। বস্ত্রহীন কিশোর দিয়ে কলাগাছকে কেটে বর্গাকারে ৩ থেকে ৪ ফুট অন্তর পোঁতা হয়। বর্গের ভেতরে মাটিলেপন করে শুকানো হয়। পরে চুন, হলুদ দিয়ে আল্পনা আঁকা হয়। রঙ্গীন কাগজে সাজানো হয়। সিঁড়ি নির্মান হয়। বর্গটির কোন এক কোণায় গর্তকরে একটি ব্যাঙ রাখা হয়। আচার অনুষ্ঠানের জন্য গ্রামে ঘুরে চাউল সংগ্রহ করা হয়। গর্তে রাখা ব্যাঙের মাথা কামানোর এ অনুষ্ঠানে গ্রামবাসী অংশ নেয়। বিশেষ করে মহিলারাই এ অনুষ্ঠানের মুল কর্ণধার। সন্ধ্যার পর ব্যাঙের মাথা কামানোর জন্য গ্রামের সকল মহিলা একত্রিত হয়ে গীত গাইতে বসে। নির্ধারিত নাপিত ব্যাঙের মাথা কামাতে শুরু করে। মাথা কামানো শেষ হলে সকলে মিলে পানি ঢেলে দেয়। তাদের ধারনা এ পানি ঢাললেই বৃষ্টি হবে।

মাড়ওয়ার খরচের জন্য বাড়ী বাড়ী যেয়ে চাউল সংগ্রহের সময় এরূপ গীত পরিবেশন করে-

     আম পাতা লড়েচড়ে,

     কাঠাল পাতা পড়ে,

     আমারদেশে মেঘ না আইলে বাচিনা পরানে।

     নবীর উম্মত মোরা কেনে আল্লায় মেঘ দিলানা,

     ব্যাঙ গেছে শ্বশুর বাড়ী, ব্যাঙী রইছে চাইয়া।

     কোনবালা যে আইব ব্যাঙা মেঘ রাজারে লইয়া।

সঙ্গীত চর্চ্চা:

সঙ্গীত চর্চ্চায় কেন্দুয়ার এক সময় ঐতিহ্য ছিল। পণ কেন্দুয়ার বাঈরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা করতো। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য মঞ্জুলীবাঈ, হাসুলীবাঈ, বাবুরজান, পূর্ণাবাঈ, কালীবাঈ, কান্তিবাঈ,মালাজান, হিরণবালা, ছায়াজান। এরা দিল্লী, লক্ষ্মৌ প্রভৃতিস্থানে প্রখ্যাত ওস্তাদদের কাছে তালিম গ্রহন করেছিল। কেন্দুয়া উপজেলার মোজাফফরপুর গ্রামের গাঙ্গুলী পরিবার পূর্ব থেকেই সঙ্গীত চর্চায় বেশ অগ্রগামী ছিল। বর্তমানে সে পরিবারের মলয়কুমার গাঙ্গুলী দেশের খ্যাতিমান সঙ্গীত শিল্পীদের একজন।

মেয়েলী গীত:

বিয়ে-শাদীতে কেন্দুয়া অঞ্চলে এখনো এরূপ গীত মহিলারা পরিবেশন করে।

 

             পরতমে সাজাইলাম সাত ভইন পরী

              তারি পরে সাজাইলাম, বাজনা কুমারী,

              সাত ভইনে গাইথা মালা তারার কেশে কেশে,

              রাজকুমারী গাইথা মালা আনল বিনালসুতে,

              সাত ভইন গাইথা মালা তারার গলে গলে,

              রাজ কুমারী গাইথা মালা দৈবত রাজার গলে।

              দৈবত রাজা ডইল্লা পরে পালঙের উপরে,

              আমার দৈবত রাজারে যে ভাল করতে পারে,

              চেংরা বয়সের সোনার যৈবন দান করিবাম তারে।

ক্রীড়ালোক;

কুস্তি, ফুটবল, হাডুডু, দাড়িয়াবান্দা ইত্যাদি ছেলেরা খেলে। মেয়েরা পলামঞ্জি, কউছে কাউয়া কারটাইন, কুতকুত, মোলাবাড়ী, বউ ডু-ঘু খেলে।

ছায়রবন্ধ:

বাঁশ- বেত দিয়ে যারা ভাল ঘর তৈরি করতো তাদের ছায়রবন্ধ বলা হতো। কারুকাজ করে একটি ঘর তৈরীতে একজন ছায়রবন্ধ কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হতো। ছনদিয়ে ছাউনি দিতেই একটি শুষ্ক মৌসুম অতিক্রান্ত হতো। আধুনিক সময়ে টিন দিয়ে ঘর তৈরী করলে অনুপাতিক হরে খরচ কম, তাই সে রূপ ঘর তৈরীতে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেনা। শ্রমের ন্যায্য মুল্য না পাওয়ায় ছায়রবন্ধের কাজ বন্ধ হয়েগেছে। এখন আর কোন ছায়রবন্ধের শিষ্যও নেই। যান্ত্রিক উপায়ে তৈরী হাড়ি পাতিলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী  বাজারে আসায় কুমারদেরও দিন শেষ। তাদের ছেলে মেয়েরাও লেখাপড়া করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে । কেন্দুয়ার হাতে গুনা কয়টি কামার পরিবার আছে।